পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে সেনাবাহিনীর সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এদিকে জরুরি অবস্থা জারির পর প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের বিভিন্ন সড়কে পণ্যবাহী কনটেইনার বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। প্রদেশটির বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ রয়েছে সব ধরনের ল্যান্ডফোন ও টেলিযোগাযোগ সেবা।
সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বলছে, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের আওতায় আগে জারি করা এসব পদক্ষেপ অনুমোদন করা হয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের পর জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করা হয়।
এছাড়া রোববার (১১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এসআরও (১)/২০২৬-এর মাধ্যমে সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেয়া হয়। সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, প্রদেশে ‘জীবনের নিরাপত্তা, নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষা এবং সরকারি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনাসদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসনসংক্রান্ত ঘোষণার কার্যকারিতা যত দিন থাকবে, তত দিন এই অনুমোদনও বহাল থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২৪৫ অনুচ্ছেদে সরকারকে দেয়া ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের (জিএইচকিউ) সামরিক অভিযান পরিচালনা পরিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি প্রয়োজনীয় সেনাসদস্য ও সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যা নির্ধারণ করবেন।
দ্য ডন বলছে, জরুরি অবস্থা জারির এক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার ও খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মূলত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতৃত্বাধীন। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রদেশটির সরকার পরিচালনা করছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের প্রতিষ্ঠিত এই দলটি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলে রয়েছে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসবাদ দমনের নীতি অন্যতম। এ বিরোধের কারণেই গত ৩ অক্টোবর তাদের মধ্যে চলা আলোচনা ভেঙে পড়ে।
পিটিআইয়ের অভিযোগ, খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলটিকে বাইরে রাখা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পিটিআই সন্ত্রাসবাদ দমনের নীতি পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে আসছে এবং সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছে।
অন্যদিকে, প্রদেশে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার। আফগান তালেবানের সঙ্গে সংলাপ নিয়ে প্রাদেশিক সরকারের অবস্থান নিয়েও আপত্তি রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের।
এদিকে জরুরি অবস্থা জারির পর প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ার শহরের বিভিন্ন স্থানে পণ্যবাহী কনটেইনার বসিয়ে সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পেশোয়ার রেলস্টেশনের কাছে কনটেইনার বসিয়ে খাইবার বাজার, শোবা বাজার ও এর বাইরের দিকে যাওয়ার পথ বন্ধ করা হয়েছে। এডওয়ার্ডস কলেজের কাছেও কনটেইনার বসানো হয়েছে। এর ফলে জেল রোড ও মালিক সাদ শহীদ ফ্লাইওভারে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
এছাড়া বালা হিসার দুর্গের কাছে এবং পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) কার্যালয়ের বাইরে কনটেইনার বসানো হয়েছে। এতে মল রোডে প্রবেশের পথ বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে গভর্নর হাউসের আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের খবর পাওয়া গেছে। এ জন্য অন্য জেলাগুলো থেকেও পুলিশ সদস্যদের আনা হয়েছে।
গভর্নর হাউস থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাওয়ার পথে শুধু সরকারি যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। রয়্যাল আর্টিলারি (আরএ) বাজার বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সদর এলাকার কিছু অংশে চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এর আগে শহরের প্রধান সড়ক খাইবার রোড বন্ধ করে দেয়ায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কটি শহরের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক (জিটি) রোডের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি রোডের পূর্ব অংশের সংযোগ স্থাপন করেছে। এটি শহরের অন্যতম প্রধান সড়ক এবং যান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
দ্য ডন বলছে, খাইবার রোড বন্ধ থাকায় বিকল্প সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। এলাকাটি সেনানিবাসের অংশ। সেখানে অবস্থিত রেড জোনে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে কোর কমান্ডারের বাসভবন, বেসামরিক সচিবালয়, কেন্দ্রীয় পুলিশ কার্যালয়, মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ও গভর্নর হাউসও রয়েছে।
এছাড়া প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারে ল্যান্ডফোন ও ডিএসএলসহ সব ধরনের টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে শনিবার খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশপ্রধান জুলফিকার হামিদ প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি হলে সম্ভাব্য সহিংস বিক্ষোভ ও নাশকতার আশঙ্কায় জেলা পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের ওপর জোর দেন তিনি।
এদিকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদেও বিরোধী দলগুলোর সংবাদ সম্মেলন আয়োজন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সাধারণত প্রধান বিরোধী জোট খাইবার পাখতুনখাওয়া হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে থাকে। কিন্তু ভবনটি সিলগালা করে দেয়ায় শহরের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের উপযুক্ত স্থান খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েছে জোটটি।
এ অবস্থায় তেহরিক-ই-তাহাফুজ-ই-আইন-ই-পাকিস্তান (টিটিএপি) মুরি এক্সপ্রেসওয়ের কাছে ভারা কাহু এলাকায় জামিয়া আল উইলায়ায় সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
টিটিএপির মুখপাত্র আখুনজাদা হুসাইন আহমেদ ইউসুফজাই বলেন, সংবাদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর প্রথমে তারা কেপি হাউসে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারেন, ভবনটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। এরপর তারা ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে (এনপিসি) সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে নির্ধারিত ফি দিতে রাজি থাকা সত্ত্বেও ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাদের অনুমতি দেয়নি।
আখুনজাদা হুসাইন আহমেদ ইউসুফজাই বলেন, ‘এখন আমরা ভারা কাহুতে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
