নিজস্ব প্রতিবেদক | Janata24 | চাঁপাইনবাবগঞ্জ
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্যেই পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির অভিযোগ নিয়ে কিছুদিন আগে আফজাল বিশ্বাস একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে জানান, তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে আসাদুজ্জামান টুনুর কাছ থেকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর ছেলে ও বউমার বিভিন্ন আচরণের কারণে তিনি ও তাঁর স্ত্রী হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এমনকি তাঁর ছেলে তাঁর মাকে ‘বেশ্যা’ বলেও গালিগালাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমতাবস্থায় আফজাল বিশ্বাসের স্ত্রী স্ট্রোকেও আক্রান্ত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফজাল বিশ্বাসের দাবি, তাঁর ছেলে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নিজের করে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাতে রাজি না হওয়ায় তাঁর ছেলে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং মানসিক নির্যাতন করেন।
এই পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর দুই মেয়ের কাছে থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আরও জানান, তাঁর জামাতারা তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাশাপাশি, তিনি নিজের ইচ্ছায় তাঁর দুই মেয়েকে সম্পত্তির ভাগ বুঝিয়ে দেন এবং তাঁর ছেলেকেও নিজের ভাগ বুঝে নেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু তাঁর দাবি, ছেলে প্রয়োজনীয় আইডি ও ছবি পাঠাননি।
এই কঠিন সময়ে তিনি তাঁর ভাই, ভাতিজা ও ভাগনেদের সামনে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তাঁদের কাছে সাহায্য চান। অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তাঁর ছেলে আসাদুজ্জামান টুনু তাঁদের নিয়ে কটূক্তি ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য ছড়ান, মিথ্যা মামলা সাজান এবং তাঁদের হেনস্তা করেন।
এ অবস্থায় বিষয়টি আফজাল বিশ্বাসকে জানানো হলে তিনি মামলার খরচ বহন করা কিংবা তাঁদের অন্যান্য সমস্যায় সহযোগিতা করার বিষয়ে অসম্মতি জানান বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজেকে সবার সামনে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা নিয়েছেন, অথচ গোপনে নিজের ছেলেকে সব তথ্য দিয়ে এসেছেন। তাঁদের আরও অভিযোগ, তিনি নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য আত্মীয়স্বজনদের ব্যবহার করেছেন এবং পরে বিভিন্ন বিষয়ে নিজের অবস্থান অস্বীকার করে বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়েছেন।
কে এই আফজাল বিশ্বাস ও তাঁর ছেলে আসাদুজ্জামান টুনু?
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আসাদুজ্জামান টুনু শিবিরের কর্মী ছিলেন। ওই সময়, অর্থাৎ ২০০৯ সালে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারুক হত্যা মামলায় তাঁর নাম আসামি হিসেবে ছিল বলে জানা যায়।
লেখকের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, নিজেকে বাঁচানোর জন্য তিনি ওই সময় নিজ এলাকায় ফিরে আওয়ামী লীগের লোকজনের সঙ্গে দেনদরবার করেন। নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানা কমিটির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের জন্য আত্মীয়স্বজন, বাবা ও চাচাদের সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মী হওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কাছ থেকে প্রত্যয়ন সংগ্রহ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এভাবেই তিনি আওয়ামী লীগের পরিচয়ে এতদিন চলেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে হয়রানির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করাই তাঁর অন্যতম কাজ। এমন তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে যে, তাঁদের এলাকায় মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে মানুষকে ঝামেলায় ফেলার চেষ্টার অভিযোগে একসময় বাবা ও ছেলেকে বেঁধে রাখা হয়েছিল।
খাসপাড়া মোড়ের বেসরকারি স্কুলকে ঘিরে অভিযোগ
খাসপাড়া মোড়ের একটি বেসরকারি স্কুলকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে চাঁদা দাবি করার সময় তিনি ধরা পড়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় তাঁর বাবাকেও খাসপাড়া মোড়ে আটকে রাখা হয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তীতে বর্তমানে তাঁর ছেলে যাঁকে প্রধান ভিলেন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, সেই রইশুদ্দীন মাস্টার গিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন বলে।
এ বিষয়ে গ্রামে একটি সালিশ অনুষ্ঠিত হলে তিনি ক্ষমা না চেয়ে চোরের মতো ঢাকায় পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অভিযোগ
এ ছাড়া, রাজশাহীতে তাঁর বোনের বাসায় থেকে পড়াশোনা করার সময় বোনের পরিবারের অনুপস্থিতিতে বাসায় নারী নিয়ে এসে সময় কাটানোর অভিযোগ রয়েছে। ঢাকায় অবস্থানকালেও বিভিন্ন নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সম্পত্তি নিয়ে বর্তমান বিরোধ
বর্তমানে আসাদুজ্জামান টুনু তাঁর দুই বোন, তাঁদের স্বামী এবং তাঁদের ছেলে-মেয়েদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, তাঁরা চাপ প্রয়োগ করে সব সম্পত্তি নিজেদের দখলে নিয়েছেন।
অন্যদিকে, আফজাল বিশ্বাস নিজেই বিভিন্ন জায়গায় স্বীকার করেছেন যে, তিনি যা করেছেন, তা নিজের ইচ্ছায় করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ছেলের সামনে ভালো সেজে থেকেছেন এবং ছেলের কাছে নিজেকে নির্যাতিত হিসেবে উপস্থাপন করে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েছেন।
আসাদুজ্জামান টুনুর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমানে আসাদুজ্জামান টুনু তাঁর কয়েকজন সহযোগীকে দিয়ে ফেসবুকে আফজাল বিশ্বাসের ভাই, ভাতিজা, ভাগনে, মেয়ের জামাই এবং নাতি-নাতনিদের উদ্দেশে অকথ্য ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করিয়ে হয়রানি করছেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
১. হিমেল হাসান ও তাঁর ছোট ভাই আহসান হাবিব শিমুল
হান্নানের ছেলে হিমেল হাসান ও তাঁর ছোট ভাই শিমুলের বিরুদ্ধে আসাদুজ্জামান টুনুর পক্ষ নিয়ে তাঁদের পারিবারিক বিষয়ে জড়িয়ে পড়া এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অশালীন আচরণ করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হান্নান বাড়ির এক গৃহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন এবং সেই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া একটি মেয়ে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে তাঁর কাছে সম্পত্তির ভাগ ও পিতৃপরিচয়ের দাবি নিয়ে আসেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও বিরোধ সৃষ্টি হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মেয়ে বাবার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য বাড়িতে এলেও তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং এ নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া, হান্নান ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে তাঁদের বোনদের জমিজমার ভাগ বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমানে হান্নানের দুই ছেলে হিমেল ও শিমুল আসাদুজ্জামান টুনুর পক্ষ নিয়ে পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন ভাষা ব্যবহার করছেন।
হিমেলের ছোট ফুফু জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে ফোন করলে হিমেল তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

২. মুনতাসির আহমেদ নাইম ও তাঁর ভাই নিয়ন
মুনতাসির আহমেদ নাইম ও তাঁর ভাই নিয়নকে নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা মজু হাজী নামে পরিচিত এক ব্যক্তির পোতা এবং মমতাজ উদ্দীন ওরফে এমপির ছেলে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মজু হাজীর বয়স বর্তমানে আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ বছর। প্রায় ছয়-সাত বছর আগে খাসপাড়া মোড়ের এক ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার সময় তিনি হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি অর্থের বিনিময়ে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রায় এক বছর আগে তাঁর বংশধর নিয়ন এক মেয়েকে কেন্দ্র করে বিষপান করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাইমের বিরুদ্ধেও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নাইম ও নিয়ন দুজনই আসাদুজ্জামান টুনুর পক্ষ নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে গালিগালাজ ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করছেন।

এলাকাবাসীর দাবি
সব মিলিয়ে, আফজাল বিশ্বাস ও তাঁর ছেলে আসাদুজ্জামান টুনুকে ঘিরে পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আসাদুজ্জামান টুনু ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর যথাযথ বিচার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে, আফজাল বিশ্বাসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোরও সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিরোধের কারণে সংশ্লিষ্ট পরিবার ও আত্মীয়স্বজন দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাঁরা চান, এই ঘটনার সঠিক সমাধান হোক এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
গোটা সমাজের এখন একটাই দাবি—আসাদুজ্জামান, তার সহযোগী এবং তার বাবার বিরুদ্ধে ওঠা প্রতারণার অভিযোগের ভিত্তিতে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি,সমাজ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হোক।
