আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে এমন ১৭টি প্রধান ঝুঁকির তালিকার শীর্ষে রয়েছে এআই ও পারমাণবিক সংঘাত। তালিকায় রয়েছে ধনী দেশগুলোর সহায়তা হ্রাস, জলবায়ু সংকট এবং শৈশবকালীন অপুষ্টির মতো বিষয়গুলোও।
‘দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই ঝুঁকিগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি সম্পর্কিত। তাই এগুলো একসঙ্গেই মোকাবিলা করতে হবে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি হুমকি মোকাবিলার জন্য ‘বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের পথ’ খোলা রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের পরিচালক ও কমিশন কো-চেয়ার অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, ‘আজকের বিশ্বনেতাদের গৃহীত সিদ্ধান্তই পরবর্তী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও সার্বিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।’
বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকিগুলোর কারণে অসুস্থতা, পঙ্গুত্ব কিংবা অকালমৃত্যুর হার কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তা মডেলিং করে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পরিমাপের এই সূচকটি ‘ডিজঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ (ড্যালি) নামে পরিচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জৈবাস্ত্রের ব্যবহারসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর প্রয়োগ এবং পারমাণবিক যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক খাদ্যসংকট আগামী ৭৫ বছরের মধ্যে মানবজাতিকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।’ এতে আরও বলা হয়, এমন ঘটনার আশঙ্কা কম হলেও এগুলো মানবজাতিকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে।
উদাহরণস্বরূপ, বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বিশাল পরিমাণ ধূলিকণা বা কণা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্যালোক আটকে দিতে পারে পারমাণবিক সংঘাত। এর ফলে বিশ্বব্যাপী চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে এআই-সৃষ্ট জৈবাস্ত্রও মানবজাতির জন্য একইরকম ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত ‘দ্য ল্যানসেট’-এর একটি সম্পাদকীয় মন্তব্যেও সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘এই আশঙ্কাগুলো যদি সত্যি হয়, তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা মানবজাতির ওপর এক মহাপ্রলয় নামিয়ে আনবে।’
তালিকাভুক্ত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে যেগুলো যৌথভাবে ১০০ কোটিরও বেশি সুস্থ মানুষের জীবনের ক্ষতি করতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: বায়ুদূষণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস), শৈশবকালীন অপুষ্টি, জলবায়ু বিপর্যয়, প্রথাগত যুদ্ধ বা সংঘাত, বৈদেশিক সাহায্য কমে যাওয়া, অতিরিক্ত মদ্যপান, উচ্চ রক্তচাপ, আয়বৈষম্য, নিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়া মহামারি, স্থূলতা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ধূমপান এবং অসুস্থতাজনিত বার্ধক্য।
তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি কত বেশি সুস্থ জীবন কেড়ে নিতে পারে শুধু সেটিই দেখা হয়নি, বরং সেই ঝুঁকি সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে কি না তাও বিবেচনা করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) সংক্রামক রোগ মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক ও কমিশন সদস্য ইব্রাহিম আবু বকর বলেন, ‘আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ শুরু করিনি যে আপনাদের আমরা ভয় দেখাতে চাই, তাই মানবজাতির সামনে কতশত ঝুঁকি দাঁড়িয়ে আছে তা দেখাচ্ছি। আমরা এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে শুরু করেছি যে, আপনি যদি আন্তর্জাতিক স্তরের বা জাতীয় পর্যায়ের একজন আইনপ্রণেতা হন, তবে এগুলোই সেই সম্ভাব্য হুমকি যার মুখোমুখি আপনি হতে পারেন। আর আপনি যদি এখনই পদক্ষেপ নেন, তবে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।’
